অসমাপ্ত ভালবাসা

[b]১৯৯৮[/b]

প্রথম দেখা, অবাক চোখে তাকিয়ে থাকা। চেয়ারে পা দুলিয়ে দুলিয়ে একমনে বই পড়া; দুই ঝুঁটি আর কানে ছোট দুল,সাথে লাজুক লাজুক কথা -এই ছিল সে।

আমার দিনশেষে একবুক সুখ নিয়ে বাড়ি ফেরা। না, তখনও অক্সফোর্ডের দেওয়া সুখের সংজ্ঞা মনকে স্পর্শ করেনি। তবু বুঝতে পেরেছিলাম, এরই নাম সুখ।


২০০১

এরপর যেন বহুকালের নির্লিপ্ততা। 

কিন্তু ভালবাসা ছিল তারই গতিতে, মনের মাঝে এক-দু’রাত পরপর স্বপ্ন দেখে ফিরতো। 

তারপর কোন এক ঝড়ে আবার দেখা হওয়া। ১০ দিনের বিতর্ক, ২ দিনের ধাঁধা আর সাথে নিজেকে ধাঁধায় ফেলা।

আবার দাড়ি।



২০০২
নাহ, দাড়ি না, কমা-ই হবে।হয়তো বা তার চেয়েও ছোট কিছু।

এবার যেন ছন্দ লয় সবই ঠিক আছে।  ক্রিং ক্রিং শব্দে বাসার ফোনটা বেজে চলে, আমি দৌড় দিয়ে ধরি। ফেব্রুয়ারির মৃদু উত্তাপ কখন জুনের অবিরাম বৃষ্টিতে পরিণত হয়, বুঝতে পারি না। এদিকে জানালার পাশে রাখা  সিডি প্লেয়ারে গানের সুরও বদলে যায়। লাকী আলীর ‘কাভি এইসা লাগতা হ্যায় কে দিল মে এক রাজ হে’ হয়ে যায় হরিহারাণের ‘রোজা জানে মান”।

এক দিকভ্রান্ত দুপুরে আমার ‘পালে হাওয়া লাগা’ ভালবাসার তরী ভিড়াতে যাই একটু একটু করে। বলই- 
“পাখিরা চায় আকাশের নীল,
কবিতা চায় ছন্দের মিল
আমি শুধু চাই তোমাকে।”

- “আমি তোকে ভাল বন্ধু মনে করি।” বিষাদঘন এক সময়ের আগমনবার্তা বেজে ওঠে তার কন্ঠে। আমি হতাশ চোখে ফ্যানের দিকে তাকিয়ে কাটিয়ে দেই কিছুদিন।

না, হার মানি না। হার মানতে তখনও শিখিনি যে!
আশা বড়ই ভয়ংকর, বারেবারে আসে আর যায়। এই আশা আমায় পদার্থবিদ্যা আর রসায়নের পাতায় পাতায় ওর নাম লেখায়। জীববিজ্ঞানে লেখায় কবিতা । আর রাতভর শুধু কাঁদায়।

হয়তো তখনও পুরোপুরি ভালবাসিনি। কুঁড়ি ফুটেছে কেবল, ফুল সেতো সহস্র হস্ত দূর।
আস্তে আস্তে ভালবেসে ফেলি তার সবকিছুকে। ভাল, খারাপ, করুণা, কটাক্ষ, ভিক্ষা সবকিছুকে। শত কষ্ট বুকে নিয়ে, শত আঘাত সয়েও ভালবেসে যাই। 


[b]২০০৩[/b]

আমি দূরে দূরে থাকি। "নিজে জ্বলছি তবু আগুন ছড়াবো না", এ আমার প্রতিজ্ঞা।  
হয়তো একটু হলেও বোঝে সে।
ফেব্রুয়ারি শীতের শেষে আবারও তার আগমনী বার্তা শোনায়। কষ্ট পেতে শুরু করে সে। হয়তো সেই কষ্ট থেকে বন্ধুত্বের প্রতিদানস্বরূপ একটুকরো ভালবাসা জন্ম নেয়। প্রশ্নবোধক এক ভালবাসা।

ভালবাসা তাই একমুখী ছিল ২৯ সেকেণ্ডের হাত ধরায়। তাইতো, ভালবাসা ছিল বন্দী তার বার তিনেক “আমি তোমায় ভালবাসি” বলায়। ভালবাসা ছিল আমার তীরবিদ্ধ হৃদয়ের মধ্যেখানে, সাথে তার তীরের যন্ত্রণায়। ভালবাসা ছিল তার নব্য প্রেমিকের হাতের লাঞ্ছনায়। 

পরিণতি-অক্টোবরের এক বিকেলে আমরা চলে যাই। আমি হেঁটে, সে রিক্সায়। 


[b]২০০৪[/b]

শুরু হয় আমার পথ চলা, একা পথে।  একা পথ বলা ঠিক না। পথের আশেপাশে সে ছিলই। দেখেও না দেখার ভান করি। ঘৃণা করতে চেষ্টা করি তাকে, নিজেকে, তার প্রতি আমার ভালবাসাকে। সে আমার মনটাকে বিবস্ত্র করে, সাথে আমাকেও।কখনও একা হাতে, কখনও সদলবলে। 

অন্ধকার সীমাহীন দুর্গে তার দেয়া কষ্টগুলো অবিরত পায়চারি করে বেড়ায় । জানান দেয় তাদের উপস্থিতি। কিন্তু আমি শতভাগ চেষ্টা করেও আমার ভালবাসার একটি সুতোও খসাতে পারি না। স্মৃতি হাতড়ে তার কথাই যেন ফিরে ফিরে আসে। মনে করিয়ে দেয় তার কাছ থেকে পাওয়া প্রথম প্রেমের কথা, বাংলা দ্বিতীয়পত্র বইয়ের প্রথম পাতায় ওর গোটা গোটা অক্ষরে লেখা-

[center]"ইয়ে ইশক নেহি হে আসান
বাস ইতনা সামাজ  লিজিয়ে;
এক আগ কা দারিয়া হে
অর ডুবকে জানা হে"[/center]
সময় দাগ কাটা শুরু করে। সাথে বাস্তবতা। আস্তে আস্তে তার খেলার সাথী বেড়ে যায়। আমারও। 
এভাবেই বহু বছর কেটে যায়। অক্টোবর তবু বছর বছর ফিরে আসে। 


[b]২০১১[/b]

হঠাৎ ফেব্রুয়ারিতে আবার দেখা হয়। কষ্টগুলো, ক্ষোভগুলো ছাপিয়ে আবারও কেন জানি ভালবাসার জয় হয়। হয়তো একারণেই ভালবাসা অন্ধ।

ভালবাসা তাই খুঁজে ফেরে তার সেই এক মুহূর্তের হাতের স্পর্শ, গায়ের গন্ধ, কালো ঘন চুল, তার কানের দুল, কনুইয়ের কাটা দাগ।
বোধ হয়, প্রথম পরিচয়ের ১৩ বছর পর ঝুঁটি বাধা সেই মেয়েটাকে আজও তেমনি ভালবাসি,  প্রচণ্ড ভালবাসি।

মাথা জুড়ে সে দাপাদাপি করে। রাতভর তারই চিন্তা ভেতরটাকে কুড়ে কুড়ে খায়, ক্ষণে ক্ষণে আনন্দ দেয়। সাথে যোগ হয় ফরেস্ট গাম্প আর ভালবাসার গান। 

আবার দেখা করি, পৃষ্ঠাভর্তি কথা নিয়ে। 

নাহ-মুখোমুখি বসেও কিছু বলতে পারি না।  তাকিয়ে থাকি তার দিকে অব্যক্ত এক যন্ত্রণায়। 

শেষে এক মুখ ব্যর্থতার হাসি দিয়ে উঠে দাঁড়াই, হাতে এক টুকরো কাগজ ধরিয়ে দিয়ে। 

বাইরে এসে হেসে হেসে নিজেকে শোনাই-
[center]"বহুদিন মনে ছিল আশা
প্রাণের গভীর ক্ষুধা
পাবে তার শেষ সুধা
ধন নয় মান নয় কিছু ভালোবাসা
করেছিনু আশা।"
[/center]

মধ্যযুগীয় প্রেম

“যাকে জয় করা যায় না-জয়া। আসলেই ওকে আমি কোনদিন জয় করতে পারিনি।
নিঃস্বার্থ এক ভালবাসা সে দিয়েছে আমায়। তার ভালবাসার গভীরতা মাপতে গেলে আমি হারিয়ে যাই।
প্রতিদান চায়নি সে। চায়নি ওর স্বল্পায়ুকে আমার সাথে জড়াতে।
এক অদৃশ্য দেয়াল রেখেছে সবসময়। তবু যেন ভালবাসাটাকে এতটুকু কমতে দেয়নি। আমাকে আগলে রেখেছে সবসময়। সবকিছু থেকে।
আশ্চর্য এক মানুষ সে। পৃথিবীর সব বস্তুগত চাওয়া পাওয়াকে উপেক্ষা করে সে ভালবেসেছে চিত্তের আনন্দের জন্যে নয়, কাউকে দেখাবার জন্য নয়; শুধুমাত্র ভালবাসার জন্যে। ভালবাসতে গিয়ে সে মা-বাবাকে ভুলে যায়নি। শুধু ভুলে গিয়েছিল নিজেকে সাধারণ রাখতে। নিজেকে স্থবির করে গমন করেছিল এক অসাধারণ পথে।
কান্না যে পথের নিত্যসঙ্গী।
আজকের এ যুগে এমন মানুষ পাওয়া সত্যি বড় কঠিন। মাঝে মাঝে মনে হয় শুধু কঠিনই নয়, অসম্ভব।
তার ভালবাসা যে পেয়েছে তার জীবনও বদলে গেছে নানা আঙ্গিকে। জীবনের সংজ্ঞাকে সে নতুনভাবে উপলব্ধি করেছে । সে সংজ্ঞায় জাগতিক অভিলাষ, অন্যায় ইচ্ছা কিংবা লোক দেখানো কিছু ছিল না। ছিল শুধুই বিস্ময় ও ভালবাসা- একটি মানুষ কিভাবে এত ভালবাসতে পারে।
গায়ে প্রচন্ড জ্বর। ঘোর ঘোর লাগছে। ভোর হবে হবে ভাব।
নিজেকে ব্যস্ত রাখি, প্রতিনিয়ত। জয়াকে ভুলতে।না, না, ভুলে যাওয়া তাকে সম্ভব নয়। সম্ভব নয় তাকে আড়াল করে রাখা।
নিজেকে হাতড়ে বেড়াই প্রতিদিন। তাকে খুঁজি। পাইনা, নিরাশও হইনা। তাকেই যে আমার চাই। অন্য কাউকে দিয়ে যে হবে না।
জানালা দিয়ে লুপ্তমান তারাগুলোকে দেখি। সেগুলো নিভু নিভু করে জ্বলছে। তুমিও কি তারাদের সাথে জয়া? আমাকে নেবে না?নেবে না তোমার সাথে।”
২.
মর্গের বাইরে কতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে বলতে পারবে না শিবেন । সকাল থেকে বসে আছে। অসংখ্যবার ডাক্তার নার্স সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে তবু কেউ কিছু বলতে পারছে না।
খবর পেতে দু’দিন লেগেছে। পাড়া-পড়শি জেনেছে একদিন পর। ৪ দিনের মাথায় শহরে এসে শিবেন জানতে পারে লাশ এখনো মর্গে।
জামার কোণা দিয়ে চোখ মোছে শিবেন।
ছেলে হারানোর কান্না নয় তা। ইদানীং প্রায়ই চোখ ঘোলা হয়ে আসে, জানান দেয় বয়স হয়ে গেছে শিবেনের।
ছেলেকে হারিয়েছে বছর তিনেক আগেই, তিন বছর পর দেহখানার খবর মিললো মাত্র।
এক নার্স এগিয়ে আসে। শিবেন আশাগ্রস্থ হয়, খবর মিলবে ভেবে।
খবর মিলে বটে।
খবর শুনে শিবেনের মনটা একটু ভালো হয়ে যায়। মোটের উপর লাভই হলো।
ভেবেছিল টাকা পয়সা গচ্চা যাবে। দুর্মূল্যের এই বাজারে সংসার চালাতেই হিমশিম খায় শিবেন, তার মধ্যে যদি মড়ার পিছে খরচে হয়।
আসতেই চায়নি সে, পাড়াশুদ্ধ লোক জোর করে পাঠিয়ে দিল।
পৈতা ছিল বিধেয় রক্ষে, দাহ করা হয়েছে।
শিবেন ছাইভস্ম নিয়ে বের হয় হাসপাতাল থেকে, হাঁটা দেয় ঘাটের দিকে। সঙ্গে ছেলের কিছু জিনিসপত্র। বড় বড় যা কিছু ছিল, সকালেই তা বিক্রি করে দিয়েছে শিবেন। বাকী যা আছে বাড়িতে ব্যবহার করা যাবে।
ঘাটে এসে দেখে ঘাট খালি। স্টিমার সব ওপারের গেছে। অপেক্ষা করতে হবে।
শিবেন বসে ঘাটের এক কোণায়, নিরিবিলিতে। এখানে পৌঁছে পেটে দানাপানি কিছু পড়েনি। শিবেন ঠিক করে একবারে বাড়িতে গিয়ে স্নান করে খাবে।
হাতের কাপড়ের পুঁটলিটা খোলে শিবেন। বিছানার তোষক, চাদর, কয়েকটা জীর্ণ শার্ট,একখানা গীতা, জল খাবার ঘটি, কয়েকটা আধুলি আর একখানা খাতা। শিবেন ভেবেছিল খাতাটা নরেন্দ্রকে দেওয়া যাবে, কিন্তু না। খাতা ভর্তি হাবিজাবি লেখা, যার কিছুই শিবেন বোঝে না।
ফেলে দেয় খাতাটাকে ঘাটের পাশে নদীতে।
ঘোলা পানির মাঝে ভাসতে থাকে খাতাটা। ছড়িয়ে পড়তে থাকে কলমের আঁচড়, অক্ষরগুলো বিলীন হয় আস্তে আস্তে… সময়ের সাথে।

টাকা ঈশ্বর, কিন্তু ঈশ্বর ভালো লাগে না

“টাকা ঈশ্বর, কিন্তু ঈশ্বর ভালো লাগে না।”
চরম সত্য, সবাই জানে।
এ নিয়ে কিছু লেখাটাও চরম বোকামির পর্যায়ের। আমি বোকা।
এ উক্তিটাও আমার নয়, আমার এক প্রিয় মানুষের, অনেক প্রিয়।
তার মুখে কবিতা শুনি, তার হাসি দেখি, প্রাণখোলা নিশ্চিন্তমনের এক হাসি।
নিশ্চিত মন? বলতে পারি না। সব কিছু কি বলা যায় ? বলা যায় না।
তবু ভাবতে ভালো লাগে সে নিশ্চিন্ত।
আমি এই মুহূর্তে হাসছি, তার কথা ভেবে।
আমি যদি তার মত হতে পারতাম!
ঈশ্বরটাকে যদি না ভালো লাগাতে পারতাম!!!

“nothing is certain, nothing is permanent.”

এই সহজ সত্যটা আমি প্রতিদিন সকালে উঠে ভুলে যাই।
বাড়ি ফিরে আসতেই সে মনে করিয়ে দেয়।
আর এক প্রিয় মানুষ আমার। আসলেই কোন কিছুই নিশ্চিত নয়, কোন কিছু স্থায়ী নয়।
মানুষটাকে প্রায়ই ভালো করে দেখি। মানুষটার সরলতা আমার ভালো লাগে। মানুষটার অন্যের উপকার করে বেড়ানোর চেষ্টা।
হয়ত সেও একদিন আমার মত ভাবতো কিছু না কিছু তো নিশ্চিত, কিছু জিনিস তো স্থায়ী।
হয়তো সেও সকালে উঠতো ভাবতো আজ নতুন কিছু করবে, স্থায়ী কিছু। হয়তো…

“কষ্ট নেবে কষ্ট, আমার আছে লাল, নীল হরেক রকম কষ্ট”

নাহ, সে কষ্টের ফেরিওয়ালা নয়। সে শুধু কষ্ট বুকে নিয়ে সুখ বিলিয়ে যায়।
প্রচন্ড কষ্টে তার মুখ নীল হয়ে যায়, তবু সে হাসে।
অমায়িক সে হাসি।
সে বলে না, সবার মত, সুখ তুমি কি বড় জানতে ইচ্ছে করে। সে বলে না, জীবন মানেই ছলনা।
সে জানে সুখ সে পাবে না, তাই সুখ সে খোঁজে না।
সে অন্যকে সুখী করতে চায়।

তাকে দেখি, আর ভাবি কবে এমন হব, কবে?

দূরে তাকে দেখি।
অনেক দূরে।
সে আমাদের অগ্রগামী, আমাদের পথপ্রদর্শক, মতান্তে সে দলপতি।

আমি তাকে দেখি।
আমার সামনে।
হেঁটে চলেছে সে। ক্ষুধা নেই, তৃষ্ণা নেই। নেই কোন ক্লান্তি।
অবাক হই। ভাবি, কিভাবে পারে সে?

সে আমায় শেখায়, সে আমায় বোঝায়। আমি শুনে যাই একমনে।

patches of clouds…
floating…

পাঁচটা বেনসন পোঁড়ে।
পিছনে আমি, মন্ত্রমুগ্ধের মত তাদের দেখি। সামনে তখন-

“রাত্রি ক্লান্ত জীর্ণশীর্ণ আধো চাঁদের আলো
পিচ ঢালা পথ কখনও ধূসর কখনও বা কালো…
সারাটা পথ জুড়ে আমি একা
হেঁটে যাই আকাশ তারার পানে চেয়ে…”